news-details
Story

বসন্ত উৎসবের একাল ও সেকাল 

বসন্ত উৎসবের একাল ও সেকাল 


অভিষেক দত্ত রায় 

শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব সূচনার সময়, অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কালীন বসন্ত উৎসবের সঙ্গে বর্তমান বসন্ত উৎসবের পার্থক্য আলোকবর্ষ সম। প্রকৃতির নব রুপকে নৃত্য, সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে বরণ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল বসন্ত উৎসব, যত দিন গড়িয়েছে এই উৎসব সাহেবী বাঙালীদের ‘সিম্বল ট্যাটাসে’ পরিণত হয়েছে। বর্তমানে শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবে যোগ দেওয়াটা কবির আদর্শ, আনুরগ নয়, আভিজাত্যে পরিণত হয়েছে মাত্র। আগের তুলনায় আনেক ভিড় বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিরাপত্তার কড়া জাল, একই সাথে দিন দিন বদলে গেছে অনুষ্ঠানের বহু পুরাতন রীতি।
বিশ্বভারতীর ইতিহাস থেকে জানা গিয়েছে, ১৯০১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বসন্ত কালে ছোট ছোট আনুষ্ঠানের রেওয়াজ ছিল গুরুদেবের ঘনিষ্ঠ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। পরবর্তীকালে বসন্ত পঞ্চমীতে শুরু হয় আশ্রমের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গান, নাচ, আবির খেলার আনুষ্ঠা। তবে এখন যেভাবে বসন্ত উৎসব হয়, আগে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে সেকালেও সকাল, সন্ধ্যা আনুষ্ঠান হত। সকালের দিকের অনুষ্ঠানে গুরুদের থাকতেন না। সকালের দিকে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে আম্রকুঞ্জে বসন্ত ঋতুর উপর কবির লেখা গান, নাটক, কবিতা গুলি পাঠ হত, একই সাথে হলুদ শাড়ি পড়ে মেয়েরা নাচ করত। পরে শুরু হত একে অপরের গালে আবির লাগিয়ে দেওয়ার পালা। করি সেই সময় থাকতেন উদয়ন বাড়িতে। আম্রকুঞ্জের অনুষ্ঠান শেষে পড়ুয়ারা কবির পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করতেন। সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে কবি নিজেই অংশ গ্রহণ করতেন। তবে, ১৯৩২ সাল থেকে এই উৎসব যখন ‘বসন্ত উৎসব’ নামে খ্যাত হল, বহিরাগত মানুষজন উৎসব দেখতে আসতে শুরু করলেন। তখন, কবি নিজে সকালের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতেন ও নিজেই পাঠ, আবৃতি করতেন। তখনও ‘ওরে গৃহবাসী’ গানের তালে ছেলেমেয়েরে নাচ করতে করতে আশ্রন পরিক্রমা করতেন। তাল পাতার নৌকা বানিয়ে নাচের অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হত। সন্ধ্যার দিকে পূর্ণিমার চাঁদ কে সাক্ষি রেখে খোলা আকাশের নীচেই কবির লেখা নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হত। কিন্তু, কেই সময় মাইকের প্রয়োজন পড়ত না, হাতে বানানো বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হত।
যত দিন গিয়েছে বদলে গেছে চিত্রটি। দিন দিন ভিড় অনেক ভিড় বেড়েছে মানুষের। বসন্ত উতসব কেন্দ্র করে একদিনের কোটি কোটি টাকার হোটেল ব্যবসা শুরু হয়েগিয়েছে। ভিড় বাড়ার জন্য আম্রকুঞ্জ থেকে অনেক আগেই বসন্ত উৎসবের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছিল। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গৌরপ্রাঙ্গণে। পরে সেই জায়গাতেও ভিড় সামাল দেওয়া দায় হয়ে ওঠায় বর্তমানে আশ্রম মাঠে বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। উৎসব প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য বিভিন্ন ছাড়পত্রের ব্যবস্থা থাকে, সেই ছাড়পত্র নিয়েও কালোবাজারি চলতে থাকে। কবির সময় বা তাঁর পরবর্তী সময়ে কিছু কাল যে ভাবে বসন্ত উৎসব চলেছে শান্তিনিকেতনে তা হল প্রকৃতিকে ফুলে, ফলে, নৃত্য গীতে বরণ করে নেওয়ার উৎসব। কালের সাথে সেই উৎসব এক শ্রেণীর বিদেশি বাঙালীর স্ট্যাটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছে। 
প্রবীণ আশ্রমিকদের কথায়, সেই ‘ওরে গৃহবাসী, দ্বার খোল, দ্বার খোল’, ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’ গান গুলি আজও বসন্ত উৎসবে হলেও সেই পুরনো আরেগ যেন হারিয়ে গেছে। এখন বসন্ত উৎসব মানে শান্তিনিকেতনে এসে সেলফি তুলে স্যোসাল নেটওয়ার্ক সাইট গুলিতে আপলোড করা।

ইন্টারনেট চিত্ৰ।

You can share this post!

Comments System WIDGET PACK

Download Our Android App from Play Store and Get Updated News Instantly.