news-details
Story

কথায় কথায়, আতঙ্ক আর ভালোবাসার শহর

নিজস্ব প্রতিবেদন, ০২ জানুয়ারি: শিলিগুড়িতে থাকতে শুরু করার কিছুদিনের মধ্যে টের পেয়ে যাই কাকে বলে ট্রাফিক আতঙ্ক ! অনেক বড় শহর কলকাতায় জন্মকর্ম। সেখানকার অতিরিক্ত ট্রাফিক, কথায় কথায় জ্যাম এবং গাড়িঘোড়ার দ্রুতগতি সর্বজনবিদিত। তবু কিছুটা  নিয়মকানুন আছে সেখানে। ফলে ওই অভ্যাসেই শিলিগুড়ি এসে প্রথম চলাফেরা আর প্রতি মুহূর্তে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা সঙ্গে নিয়ে চলা। এখানে ট্রাফিক রুল বলে কিছু নেই বললেই চলে। ধীরে ধীরে এখানকার নিয়মেই সাবধান হতে শিখে গেলাম। এই করেই প্রায় এক বছর কেটে গেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হলো না।

আসল কথা সাবধানতা ব্যাপারটাও সামগ্রিক। পথেঘাটে শুধু নিজে সাবধানে চললেই যে আপনি দুর্ঘটনা এড়াতে পারবেন, তা তো নয়। অন্যান্য পথচারী থেকে বিভিন্ন গাড়ির চালক, সবাইকেই ন্যূনতম দায়িত্ব ও সচেতনতা নিয়ে চলতে হয়। যেটা কিছুদিন আগে আমার ক্ষেত্রে হলো, রিকশায় যেতে যেতে মুখ থুবড়ে পড়লাম রাস্তায় ! এক্ষেত্রে রিকশাচালক বারণ না শুনে স্বল্প পরিসরে ওভারটেক করতে গেল এবং উল্টোদিক থেকে আসা টোটো প্রবল বেগে এসে কিছু না দেখে দিল ধাক্কা। দুজনেই নিয়মের তোয়াক্কা না রেখে চলমান ছিলেন। গলিপথে অত দ্রুত গতিতে টোটো চালানো উচিত নয়। পাড়ার মধ্যে রাস্তা, প্রচুর মানুষ হাঁটাচলা করেন। কিন্তু এসব মোটেই মনে রাখেন না অধিকাংশ চালক। এক্ষেত্রে সব থেকে বেপরোয়া বাইকআরোহীরা, সেকথা বলাই বাহুল্য।
দুর্ঘটনায় আমার যা ঘটলো, ভাঙা ও কাটাছেঁড়া , অর্থব্যয় সেসব বিস্তারে আর যাচ্ছি না। সেটা জানানোর জন্য এই লেখা নয়। এবার যেটা বলবো, সেটা এই শহরের ভালোবাসার কথা।

দুর্ঘটনা ঘটার এক সেকেন্ডের মধ্যে চলমান পথচারী থেকে পাড়ার মানুষ, সবাই চলে এলেন কাজকর্ম ফেলে। উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করা, টুল এনে বসার ব্যবস্থা, রুমাল এগিয়ে দেওয়া, বরফ লাগানো এবং সর্বোপরি সঙ্গে থাকা। প্রবল যন্ত্রনায় কাতর আমি, সেই অবস্থাতেও ভিতরে অপরিসীম আবেগ উথলে উঠলো। আমার মতো প্রবীণ, আজ যারা কলকাতা বা যে কোনও বড় শহরের বাসিন্দা, তারা বুঝবেন এই আবেগের অর্থ। মানুষের পাশে দাঁড়াবার সময় নেই মানুষের। সেখানে শিলিগুড়ি সেদিন আপ্লুত করে দিলো আমায়। একদল অচেনা মানুষ পাড়ামাত্মীয় হয়ে কাছে রইলো চরম সংকটের মুহূর্তে।

আজন্মের শহর কলকাতা ছেড়ে আসা খুব সহজ ছিলো না। পাহাড় ভালোবেসে উত্তরবঙ্গে পাকাপাকি থাকা শুরু করার পরও প্রতি মুহূর্তে স্মৃতিতে বেদনায় ভাসিয়েছে কলকাতা। কিন্তু যাকে হৃদয়ে খুঁজি , সে তো আমার শৈশবের কলকাতা। যখন পাড়া ছিল আশ্রয় আর পাড়ার মানুষ ছিল পাড়ামাত্মীয়। এদিন শিলিগুড়ি আশ্রমপাড়ায় সেই আত্মীয়স্বজনকে খুঁজে পেলাম । হারিয়ে যাওয়া মণিমানিক্য  ফিরে পাওয়ার এই অনুভূতি সত্যি বড্ড দামি। 

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা। দুর্ঘটনার যন্ত্রণার মাঝেই বাঁচার জন্য অনেকটা অক্সিজেন পেলাম শিলিগুড়ির মানুষের ভালোবাসায়। এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে কুর্ণিশ।


অজন্তা সিনহা

You can share this post!

Comments System WIDGET PACK

Download Our Android App from Play Store and Get Updated News Instantly.