news-details

 সংবাদ মাধ্যমের সেকাল ও একাল

''বিশেষ প্রতিবেদনে শান্তনু'' পটা-দা সারাদিন খেটেখুটে সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে দেখে..ঝিঙ্কু বৌদি টিভি-র সামনে বসে মনোযোগ সহকারে সিরিয়াল দেখছে। টিভি-র চ্যানেল নিয়ে কথা না বাড়িয়ে পটা-দা শুধু বললো..ভীষণ মাথা ধরেছে,একটু চা বানাও। ঝিঙ্কু বৌদি রান্নাঘরে যেতেই রিমোট-টা দিয়ে টিভি-টা নিউজ চ্যানেলে ঘুরিয়ে দিলো। মিনিট দশেকের মধ্যেই টেবিলের ওপর ঝনাৎ করে চায়ের কাপ রাখার শব্দ..সাথে ঝিঙ্কু বৌদির রাগের চিৎকার..সবেমাত্র শাশুড়িটাকে বউটা টাইট দিচ্ছিলো..আর তুমি কিনা চ্যানেলটা চেঞ্জ করে দিলে ?
গল্পটা এবং চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও..চিত্রটা বহুক্ষেত্রেই বাস্তব ! অনেকের মতোই আমারও.."খবর"-এর খোঁজখবর সারাদিনে অন্তত একবার না রাখলে ঠিক পেটের ভাত হজম হয় না ! একদম ছোটবেলায় সেই খবর বাড়িতে আসতো রেডিও অথবা সাদা-কালো "আনন্দবাজার পত্রিকা"-র হাত ধরে। "সাদা-কালো" এইজন্য..কারণ খবরের কাগজের পাতা তখনও রঙিন হয়নি। খবরের কাগজ বলতে "আনন্দবাজার" "বসুমতি" "যুগান্তর"-এর মতো হাতে গোনা মাত্ৰ কয়েকটা। সেই খবরের কাগজও শিলিগুড়িতে আসতো ট্রেনে চেপে..একদিন পরে..পরদিন দুপুরবেলায়। স্কুলের ছোটো ক্লাসে পড়ার সময়..নিউজ পেপার হাতে পেলে প্রথমেই চলে যেতাম "আনন্দবাজার"-এর দ্বিতীয় পাতায়..যেখানে থাকতো ধারাবাহিক ভাবে "জাদুকর ম্যানড্রেক" আর "অরণ্যদেব"-এর লোমহর্ষক কমিক্স কাহিনী! তারপর শেষ পাতা..মানে খেলার পাতায়। অন্যান্য খবরের বেশিরভাগ আগেই শুনতে পেয়ে যেতাম রেডিও-তে..কারণ খবরের সময় রেডিও চালানোর একটা চল ছিল বাড়িতে। "খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়"..অথবা "খবর পড়ছি নীলিমা সান্যাল..আজকের বিশেষ বিশেষ খবর হলো"...এই আওয়াজগুলো এখনও কানে বাজে। রেডিও-তে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান-এর খেলার ধারা বিবরণী শোনার আনন্দটাও ভোলার নয়।
তখন স্কুলের গন্ডির শেষ সীমানায়..হঠাৎ জানতে পারলাম শিলিগুড়ি থেকেও কলকাতার মতোই দৈনিক খবরের কাগজ প্রকাশিত হবে আর তার অফিসটা আমাদের স্কুলের ঠিক পেছনেই..কলেজ রোডে। মনে আছে..মে মাসের গরমকাল হলেও সেইদিন বিকেলের পর থেকেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে বৃষ্টি হচ্ছিলো। বিকেলেই প্রকাশ পাওয়ার কথা.."উত্তরবঙ্গের আত্মার আত্মীয়" প্রথম সংস্করণ দৈনিক "উত্তরবঙ্গ সংবাদ"। দু-চার জন বন্ধুবান্ধব মিলে ছাতা মাথায় ওই অফিসের সামনে গিয়ে দেখি প্রচুর লোকজন প্রথম সংস্করণ হাতে পাওয়ার আশায় গিয়ে হাজির হয়েছে! অনেক ড্রিবলিং করে শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যেবেলায় হাতে পেলাম..আধভেজা একটা নিউজ পেপার। যতদূর মনে আছে..কভার পেজে ছিল গন্ডারের ছবি ওয়ালা একটা কার্টুন।
এরমধ্যেই কার্শিয়াং-এ টিভি টাওয়ারের ওপেনিং হয়ে গেছে..অনেকেরই বাড়ির মাথায় টিভির এন্টেনা শোভা পাচ্ছে। রঙিন নয়..সাদা-কালো টিভি দিয়েই শুরু দূরদর্শন দুনিয়াতে শিলিগুড়ির পথ চলা। খুলে গেলো আরও একটা বিকল্প দরজা..শুধুমাত্র নিউজ পেপার পড়া বা রেডিওতে শোনা নয়..একেবারে অডিও-ভিজুয়াল এফেক্ট ! সবাই দিল্লি দূরদর্শনের "ডিডি নিউজ" দেখেই তখন সন্তুষ্ট। সেই সময় থেকেই খুব দ্রুত গতিতে বদলাতে থাকলো মনোরঞ্জনের দুনিয়া ! এলো রঙিন টিভি,এলো কেবল চ্যানেল। শুরু হলো খবর পরিবেশনার জগতেও নানারকম প্রতিযোগিতা। কিন্তু পরবর্তীকালে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেলো..এন্ড্রোয়েড ফোন। যে ফোনের মাধ্যমে নিমেষেই খুলে গেলো গোটা বিশ্বের দরজা ! ফেসবুক কিংবা ইউটিউব-এর মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তের হাল-হকিকত জেনে নেওয়া এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অনেক বেশি মাত্রায় গ্রহণযোগ্য। তবুও বলতে হয়..আজও সকালবেলায় চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ নিয়ে টানাটানি হয়..বাজারে এতো খবরের কাগজ থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেকেরই পাঠক সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পায়। তাই আমার ধারণা..কোনও কিছুই কোনোটার বিকল্প হতে পারে না। খবরের সব মাধ্যমই থাকবে তার নিজস্ব জায়গায়.. স্বমহিমায়..!!

 

  • Tags

You can share this post!

Comments System WIDGET PACK